ছোটবেলায় পথের পাঁচালী পড়তে গিয়ে ‘আম আঁটির ভেঁপু’ অংশটা খুব অদ্ভুত লাগত। একটা আমের আঁটি থেকেও খেলনা বানানো যায়, তাকে প্রিয় করা যায় — এই ভাবনাটাই কেমন বিষণ্ন সুন্দর ছিলো। বিভূতিভূষণ ঐ তুচ্ছ আমের আঁটির গল্পে লিখেছিলেন অভাব, শৈশব, সম্পর্ক আর স্মৃতির কথামালা।
আমার নিজেরও একটা ‘আম আঁটির ভেঁপু’ আছে।
তখন ভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ার। হলরুমে থাকি। আমরা একটা বড় গ্রুপ ছিলাম। একসাথে খাওয়া, ঘোরা, আড্ডা, গল্প, রান্না, বাজার, মুভি নাইট — আরও কত কি! তো ঈদের ছুটি পড়ল। আমার ইনার সার্কেলের প্রায় সবাই একসাথে ঢাকার রুটে যাবে। খুব ভোরে ওদের ট্রেন। আমার বাস সকাল ৯ টায়। অনেক রাত অব্দি একসাথে আড্ডা দিয়েছি। তাই যাবার সময় আমায় আর ডাকে নি। হয়তো ঘুম ভাঙাতে চায় নি তাই।
ঘুম থেকে উঠে প্রায় ফাঁকা বিশাল হলরুমটা দেখে মনটা কেমন হুহু করে উঠল। ফ্রেশ হয়ে এসে দেখি ওদের কারও কারও কাপড় রশিতে ঝুলছে। গুছিয়ে রাখলাম। ভাবলাম, এতদিন পর আসবে, ধুলো পড়ে যাবে। তাই যার যা চোখে পড়ল, ঢেকে দিলাম।
সেদিন ক্যান্টিনেও নাস্তা হতো না। তাই আগের দিন বিকেলেই সবাই মিলে কিছু আম কিনে এনেছিলাম, সকালে হালকা কিছু খেয়ে বের হবো বলে। তো আম খেতে বসবো, তখনই খেয়াল করলাম একটা প্লেট ঢাকনা দেয়া। খুলে দেখি ৫-৬ টা আমের আটি। বুঝলাম আস্ত আম আর একটাও নেই। আমের আঁটি আমি খাই না। নিমিষেই শূন্যতাটা কেমন অভিমান আর অপমানের মাঝামাঝি এক অনুভূতিতে বদলে গেলো। নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম এটা কোনো বিষয় না, হয়তো তাড়া ছিলো। কিন্তু ঐ যে, কিছু অনুভূতি থাকে না, যেগুলো যুক্তি মানতে সময় নেয়। বেশি সময় লাগে নি যদিও।
আজ এত বছর পর আমার মেয়েদের খুব উৎসাহ নিয়ে আমের আঁটি খেতে দেখে সেই পুরনো ‘ভেঁপু’ বেজে উঠল। মনে হলো প্লট বদলে গেলে একটা আমের আটি কখনও শৈশব হয়ে রয়ে যায়, কখনও বন্ধুত্ব, কখনও এক ফাঁকা হলরুমের নিঃশব্দ সকাল।

