আজ প্রায় পূর্ণিমা। সারাদিন বৃষ্টি ছিল। একটু আগেই আকাশ যখন কিছুটা পরিষ্কার হলো, বেশ শান্ত স্নিগ্ধ লাগছিলো চারপাশ। এখন আবার ঝিরিঝিরি বৃষ্টি।
এমন ঘোর জাগানিয়া ওয়েদারে আসিফ বারান্দায় তার কোজি চেয়ারে বসে আছে। সামিয়া, ওর স্ত্রী, ওদের দেড় বছরের বাচ্চাকে নিয়ে বাবার বাড়ি গেছে। সামিয়ার ছোট বোন অস্ট্রেলিয়া থেকে এসছে, থাকবে কিছুদিন। এই কয়দিন বাসাটা খালি থাকবে। কোন কোলাহল নেই, কর্মযজ্ঞ নেই। নেই নিষেধ বারণের কেউ। আসিফ অবশ্য কাল যাবে শ্বশুর বাড়ি, উইকেন্ড কাল। আজ তাই আক্ষরিক, ভাবার্থ সব অর্থেই চাঁদ রাত!
রাতের প্ল্যান হলো কিছুক্ষণ বারান্দায় চিল, তারপর ভরপেট ডিনার, সবশেষে নেটফ্লিক্সে মুভি দেখতে দেখতে একসময় ঘুমিয়ে পড়া। একটা লং স্ট্রেসড ডে-এর পরে, এর চেয়ে বেশি আরামের কিছু, এই মুহূর্তে ভাবতে পারছে না আসিফ। আধ ঘণ্টা হলো সে খাবার অর্ডার করেছে, এখনো আসেনি। অপেক্ষা করতে তার তেমন আপত্তি নেই আজ। কারণ, আজকের রাতটা সে নিজের গতিতে কাটাবে ঠিক করেছে।
তো বারান্দায় শোকেস থেকে নামিয়ে এনেছে একটা গোবলেট; ওর স্ত্রীর খুব শখের জিনিস। বছর তিন আগে ইউরোপ ট্যুরে গিয়ে এনেছিল ওটা; একটা ছোট্ট, পুরোনো গ্রামের তার চেয়েও প্রাচীন এক দোকান থেকে। গোবলেটটা দেখতে অদ্ভুত সুন্দর – না খুব চকচকে, না খুব পুরোনো। হাতে নিলে কেমন শেক্সপিয়রের কোনো চরিত্রের অনুভূতি হয়! আসিফ ওটার নাম দিয়েছিলো ‘রোমান্টিক গোবলেট’।
ফ্রিজ থেকে নিজের পছন্দের রেড ওয়াইনটা বের করে ধীরে ধীরে গোবলেটটায় ঢালল সে। ব্লুটুথ মিউজিক প্লেয়ারে গান চলছে, “আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে…”। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে প্রথম চুমুকটা নিতে নিতে সে ভাবলো, “ভালোই তো আছি! বেচে থাকাটা খারাপ না!”
ডেলিভারি বয় খাবার দিয়ে গেছে একটু আগে, কিন্তু ক্ষুধা নেই এখন আর। কিছুক্ষণ পর তার মনে হলো, বারান্দার আলোটা কেমন একটু বদলে গেছে – লালচে, অথচ সুন্দর, ঘোরলাগা সুন্দর। ঘুম পাচ্ছে আসিফের, কিন্তু এই ঠান্ডা হাওয়া ছেড়ে উঠে বেডে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। তার মনে হচ্ছে অনন্ত কাল সে এই আলো আঁধারি আর মায়াবী সুরের মূর্ছনায় কাটিয়ে দিতে পারে। হঠাৎ তার মনে হলো, কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে পাশেই। কিন্তু এমনটাতো হবার কথা না। তবু তার বিশ্বাসকে গুরুত্ব দিতেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে দেখল। বারান্দার গ্রীল ধরে চাঁদের দিকে চেয়ে আরশি দাঁড়িয়ে আছে। আসিফ থতমত খেয়ে যায় প্রথমেই। কিছুক্ষণ মুখ থেকে রা টুকুও বের করতে পারে না। তারপর কি বলবে বুঝতে না পেরে সোজাসুজি বলে ফেলে, “দড়জাটা খোলাই ছিলো!” আরশি উত্তর দেয়, “হুমম।” একদম স্বাভাবিকভাবে। যেন এই বাসায়, এই বারান্দায় সে আগেও এসেছে। এখানে অবাক করা কিছু নেই!

